মঙ্গলদের মহাক্যাবিক ধ্বংসাত্মক ইতিহাস

মঙ্গলদের মহাক্যাবিক ধ্বংসাত্মক ইতিহাস

মঙ্গল কারাঃ মঙ্গোল জাতির ইতিহাস লিখিত আকারে না থাকায় তার উৎস সন্ধান সহজ নয়। মঙ্গোলরা ছিল মধ্য এবং উত্তর এশিয়ার এক যাযাবর গোষ্ঠী। যেটা এখন তুর্কমেনিস্তান থেকে মঙ্গোলিয়া পর‌্যন্ত বিস্তৃত। তারা এই অঞ্চলের ধূ ধূ বৃক্ষহীন প্রান্তরে বসবাস করতো। প্রতিনিয়ত স্থান পরিবর্তন আর যাযাবরবৃত্তিই ছিল তাদের জীবনধারণের একমাত্র শৈলী। সকল কাজেই তারা সবসময় ঘোড়ার উপর নির্ভরশীল ছিল, ঘোড়াই ছিল তাদের যোগাযোগের মূল মাধ্যম। তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল বস্তুকেন্দ্রিক বহু ঈশ্বরবাদ। সুবৃহৎ ও সুপ্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্য এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থা তারা কখনোই গড়তে পারেনি, বরং উত্তর চীনের বিভিন্ন গোত্রের মাঝে নামেমাত্র সন্ধিচুক্তি ও জোট স্থাপনের মাধ্যমেই জীবন ধারণ করে গিয়েছে।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, মঙ্গোলরা সবসময়ই তাদের প্রতিবেশীদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত থাকতো। তাদের দক্ষিণে বসবাসরত চীনারা মূলত মঙ্গোল ও অন্যান্য আক্রমণকারীদের থেকে নিজেদের গ্রামবাসীদের রক্ষার্থেই চৈনিক সম্রাট শি হুয়াং (২৪৭-২২১ খ্রিস্টপূর্ব) এর আমলে ‘দ্যা গ্রেট ওয়াল’ নির্মাণ করে। শুধু তাই নয়, মঙ্গোলরা মধ্য এশিয়ার অন্যান্য গোত্র যেমন তুর্কি এবং তাতারদের সাথে নিয়মিত দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষে লিপ্ত ছিল। আধুনিক মঙ্গোলিয়ার এলাকা ইতিহাসজুড়ে বিভিন্ন চিনা সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। মঙ্গোল সাম্রাজ্য ১২শ শতকের শুরুতে মঙ্গোল সেনাপতি চেঙ্গিস খান প্রতিষ্ঠিত একটি বিশালাকার সাম্রাজ্য। ১২শ শতকের শেষে এসে প্রায় সমস্ত পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া এবং মধ্য ইউরোপ পর্যন্ত এটি বিস্তৃত ছিল। এটি ইতিহাসের সর্ববৃহৎ অবিচ্ছিন্ন স্থলসাম্রাজ্য।

মঙ্গল সামাজ্য প্রতিষ্ঠা ও বিস্তারঃ মঙ্গোল ইতিহাস (এবং সাথে বিশ্বের ইতিহাসও) চিরদিনের জন্য বদলে যায় চেঙ্গিস খানের শাসনামলে। চেঙ্গিস খান ছিল ১২০৬ থেকে ১২২৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মঙ্গোলদের একজন গোত্রীয় প্রধান। তার শাসনকালে সে বহু মঙ্গোল গোত্রকে অন্যান্য তুর্কি গোত্রের সাথে ঐক্যবদ্ধ করতে সমর্থ হয়। এর মাধ্যমে সে এক সুবৃহৎ ও ঐক্যবদ্ধ দল গড়ে তোলে এবং শুরু করে এমন এক জয়যাত্রা যা জয় করে নিয়েছিল ততদূর পর্যন্ত ভূখণ্ড যতদূর পথ মঙ্গোল ঘোড়সওয়াররা পাড়ি দিতে পারে।

১২২০-এর দশকের মধ্যে চেঙ্গিস খানের সেনাবাহিনী লুটপাট করে ফেলে এশিয়া এবং ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল

চেঙ্গিস খান ১২১০-এর দশকে উত্তর চীনের বেশীরভাগ অংশ দখল করে নেয়। এর মাধ্যমে সে জিয়া এবং জিন সাম্রাজ্য ধ্বংস করে, সাথে বেইজিংও দখল করে নেয়। মধ্য এশিয়ার বেশীরভাগ তুর্কি গোত্রগুলোও সে দখল করতে সমর্থ হয় এবং এভাবেই পারস্য পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এর মাধ্যমে সে পূর্ব ইউরোপেও সৈন্যবাহিনী পাঠায়। রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল এবং এমনকি মধ্য ইউরোপের জার্মান প্রদেশগুলোতেও আক্রমণ চালায়। ১২২৭ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত ২১ বছর তিনি ইউরোপ ও এশিয়ার বিস্তীর্ণ অংশে ধ্বংসযজ্ঞ চালান ও নিজের জাতিকে সমৃদ্ধ করেন।

চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর পরও অভিযান থেমে থাকেনি। তার উত্তরাধিকারিরা কোরিয়া থেকে পোল্যান্ড পর্যন্ত ভূভাগ নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে আসেন। তবে ১২৬০ এর দশক থেকেই তাদের ভাঙ্গন শুরু হয় এবং ১২৯০ সালের মধ্যে এই বিশাল সাম্রাজ্য ৪ ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

ধ্বংসকারী জাতি হিসেবে মঙ্গলঃ মুসলিমদের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে কিছু লুণ্ঠন এবং গণহত্যা চালালেও চেঙ্গিস খান মুসলিম অঞ্চলের খুব ভেতরে আক্রমণ করেনি। তার উত্তরাধিকারী ওগেদেই খানের সময়ও মুসলিমরা বারবার মঙ্গোলদের রোষানলে পড়া থেকে বেঁচে যায়। তবে ১২৫৫ খ্রিস্টাব্দে এই শান্তির অবসান ঘটে। বিখ্যাত মংকে খান, তার ভাই হুলাকু খানের উপর এক সেনাবাহিনীর দায়িত্ব অর্পণ করে যাদের লক্ষ্য ছিল পারস্য, সিরিয়া ও মিশর দখল করা এবং সাথে আব্বাসী খিলাফতও ধ্বংস করা। জানা যায়, ইসলামকে ধ্বংস করে চিরতরে পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলাই ছিল এই অভিযানের মূল লক্ষ্য। এমনকি হুলাকু খানের নিজেরও ইসলাম সংক্রান্ত সকল ব্যাপারে তীব্র ঘৃণা এবং বিদ্বেষ ছিল, যার বেশিরভাগই উৎসরিত হয়েছিল মূলত তার বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান উপদেষ্টাদের মাধ্যমে যারা হুলাকু খানের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক পদক্ষেুপে বড় ভূমিকা পালন করতো।

মঙ্গোল আক্রমণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মতো কোন অবস্থাই তখন মুসলিম বিশ্বের ছিলনা। আব্বাসী খিলাফতের উপস্থিতি ছিল নামে মাত্র, যাও কিনা তাদের পূর্বাপর খ্যাতিকে পুঁজি করে। বাগদাদের বাইরে তাদের কোন প্রভাবই ছিলনা। খাওয়ারাজমীয় সাম্রাজ্যের অবস্থা খুবই নাজুক হয়ে যাওয়ায় পারস্যজুড়ে অনৈক্য প্রকট আকার ধারণ করে। সালাহ আল-দ্বীন আল-আইয়ুবী (সালাহুদ্দিন আইয়ুবী) প্রতিষ্ঠিত আইয়ুবী সাম্রাজ্যের হাতে ইরাক ও সিরিয়ার কিছু ক্ষুদ্র অংশের নিয়ন্ত্রণ ছিল মাত্র। অন্যদিকে মিশরে সাম্প্রতিক বিদ্রোহ সালাহ্‌ আল-দ্বীন আল-আইয়ুবীর বংশধরদের পতন ঘটায় এবং নতুন মামলুক সুলতানাতকে ক্ষমতায় নিয়ে আসে। বাস্তবে নিজের সুবিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে হুলাকু খানকে খুব বেশী প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়নি।

বাগদাদ ধ্বংসযজ্ঞঃ ৭৬২ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসী খলিফা আল-মানসুরের পৃষ্ঠপোষকতায় বাগদাদ নগরী প্রতিষ্ঠা হয়। এই নগরীর ইতিহাসজুড়েই এটি ছিল মুসলিম বিশ্বের রাজধানী এবং সাথে গোটা বিশ্বেরও রাজধানী। বাগদাদের লাইব্রেরীগুলো ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বাইতুল হিক্‌মাহ (The House of Wisdom) ছিল বিশ্বের সবচেয়ে তুখোড় ও প্রখ্যাত বিজ্ঞানী, চিন্তাবীদ, গণিতবীদ এবং ভাষাতত্ত্ববিদদের জন্য তীর্থস্থানের মতো। খলিফাগণ ছিলেন বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্য চর্চার পৃষ্ঠপোষক।

যদিও সময়ের সাথে ১৩শ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে এসে বাগদাদের সেই আকর্ষণ ও গুরুত্ব হারিয়ে যায়। খলিফারা ছিল নামে মাত্র নেতা এবং মানুষের জন্য কাজ করার মাধ্যমে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি অর্জনের চেয়ে দুনিয়াবি ভোগ-বিলাসেই তারা মত্ত্ব ছিল। আব্বাসী সেনাবাহিনীর বলতে গেলে কোন অস্তিত্বই ছিলনা, তাদের গণ্ডি শুধুমাত্র খলিফার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী হিসেবে কাজ করার মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। আর মুসলিমদের বৈজ্ঞানিক গবেষণার কেন্দ্রও সময়ের সাথে বাগদাদ থেকে স্থানান্তরিত হয়ে চলে যায় কায়রো, আল-আন্দালুস (মুসলিম স্পেন) এবং হিন্দুস্তানে।

এই সেই ঐতিহাসিক শহর যেখানে ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে মঙ্গোলরা এসে পৌঁছায়। তাদের সেনাবাহিনী ছিল আনুমানিক দেড় লক্ষ সৈন্যবিশিষ্ট। বাগদাদ, নগরীটি তখন আর ৯ম খ্রিস্টাব্দের মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রের ছায়া ব্যতিত আর কিছুই নয়। মঙ্গোল বাহিনী জানুয়ারী মাসের মাঝামাঝিতে অবরোধ শুরু করে যা প্রায় দুই সপ্তাহ স্থায়ী ছিল। অবশেষে ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখে মঙ্গোলরা খলিফাদের এই শহরে প্রবেশ করে।

মঙ্গোল বাহিনীর বাগদাদ অবরোধ

পুরো এক সপ্তাহকাল ধরে লুঠতরাজ ও ধ্বংসযজ্ঞ চলে। এসময় মঙ্গোলরা কোন ধরনের বাছ-বিচার করেনি। অবাধে মসজিদ, হাসপাতাল, লাইব্রেরীসহ বিভিন্ন স্থানে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যায়। বাগদাদের লাইব্রেরীসমূহের বইগুলো টাইগ্রিস নদীতে এতো বেশী পরিমাণে ছুঁড়ে ফেলা হয় যে নদীর পানি (বইয়ের কালির কারণে) কালো রং ধারণ করে। সত্যি বলতে বইগুলো নদীতে ছুঁড়ে ফেলায় কিংবা পুড়িয়ে ফেলায় কি পরিমাণ জ্ঞান যে সেদিন পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিল সেটা আমরা আর কখনোই জানতে পারবনা।

যাই হোক, বইয়ের চেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল প্রাণহানি। ধারণা করা হয় ধ্বংসযজ্ঞের সেই এক সপ্তাহে ২ লক্ষ থেকে ১০ লক্ষ মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। বাগদাদ বসবাসের অযোগ্য এবং সম্পূর্ণ জনমানবহীন শহরে পরিণত হয়। পুনরায় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোন শহরে পরিণত হতে বাগদাদের আরো কয়েক শতাব্দীকাল লেগে যায়।

জলন্ত লাইব্রেরী

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় লাইব্রেরীর পতনঃ বিধ্বস্ত বাগদাদের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন হালাকু খান। সামনে এত বই দেখে বেশ বিরক্তই হলেন তিনি, খেঁকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এটা কী? এখানে এত বই কেন?” জবাবে তার দুই চাটুকার নাসিরুদ্দিন তুসি ও ইবনে আলকামি বলে ওঠে, “এটা বিশ্বের সর্ববৃহৎ গ্রন্থাগার।” এটা শুনে হালাকু আরও ক্ষেপে যান, নির্দেশ দেন গ্রন্থাগার পুড়িয়ে ফেলার। তুসি ও ইবনে আলকামি তাকে এ থেকে নিবৃত্ত করতে চাইলে তিনি বিদ্রুপের কন্ঠেই সেদিন বলেছিলেন, “মুসলিমরা কি এত এত বই পড়েও শিক্ষা নেয়নি যে কী করে নিজেদের রাজ্য রক্ষা করতে হয়? যে বই তাদের নিজেদের রক্ষা করতে শেখায়নি, সে বই দিয়ে কী হবে?”

এভাবেই কুখ্যাত হালাকু খানের নির্দেষে বাগদাদের সকল লাইব্রেরির কিতাব ছুড়ে ফেলা হয় টাইগ্ৰিস নদীতে। এতো পরিমাণে কিুতাব ছিল যে সেসবের কালিতে টাইগ্ৰিস নদীর পানি কালো হয়ে যায়। এমনকি বাগদাদের বিখ্যাত হাউজ অফ উইজডমটিও ( বাইতুল হিকমাহ ) ধ্বংস করে দেয়। ফলে চিকিৎসা থেকে জ্যোতির্বিদ্যাসহ বিভিন্ন বিষয়ের উপর রচিত অসংখ্য মূল্যবান বই হারিয়ে যায়। পালিয়ে যেতে চেষ্টা করা নাগরিকদেরকে মঙ্গোলরা গণহারে হত্যা করে। এমনকি রেহাই পায়নি নারী ও নিষ্পাপ শিশুরাও। এই হত্যাযজ্ঞে প্রায় ৯০,০০০ এর মত নাগরিক নিহত হয়েছে বলে অভিমত রয়েছে। অন্যান্য সূত্রে ভিন্ন সংখ্যা পাওয়া যায়। দ্য নিউ ইয়র্কারের ইয়ান ফ্রেজিয়ারের মতে মৃতের সংখ্যা ২,০০,০০০ থেকে ১০,০০,০০০। মানুষ কী ভুলতে পারবে ইতিহাসের পাতায় লেখা সেই ১২৫৮ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারিকে! নিমিষেই গুড়িয়ে যাওয়া সেই সোনালি যুগের প্রাণকেন্দ্রকে!

মঙ্গল সম্রাজ্য ও ইয়াজুজ মাজুজঃ ইয়াজুজ মাজুজের সাথে মঙ্গল সাম্রাজ্যের সম্পর্ক রয়েছে। তারা কিয়ামতের পূর্বে মঙ্গল জাতি থেকেই বের হবে। কুরআন মাজীদে এ জাতির বিস্তারিত পরিচয় দেয়া হয়নি। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে তাদের নাক চ্যাপ্টা, ছোট ছোট চোখ বিশিষ্ট। এশিয়ার উত্তর পুর্বাঞ্চলে অবশিত এ জাতির লোকেরা প্রাচীন কাল হতেই সভয় দেশ সমুহের উপর হামলা করে লুটতরাজ চালাত। মাঝে মাঝে এরা ইউরোপ ও এশিয়া উভয় দিকে সয়লাবের আকারে ধবংসের থাবা বিস্তার করতো।
বাইবেলের আদি পুস্তকে(১০ম আধ্যায়ে) তাদেরকে হযরত নুহ (আ:) এর পুএ ইয়াকেলের বংশধর বলা হয়েছে। মুসলিম ঐতিহাসিকগণও একথাই মনে করেন রাশিয়া ও ঊওর চীনে এদের অবস্থান বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। সেখানে অনুরুপ চরিত্রের কিছু উপজাতি রয়েছে যারা তাতারী, মঙ্গল, হুন ও সেথিন নামে পরিচিত।
তাছাডা একথাও জানা যায় তাদের আক্রমন থেকে আত্নরক্ষার জন্ন ককেম্পসের দক্ষিণাঞ্চলে দরবন্দ ও দারিয়ালের মাঝখানে প্রাচীর নির্মান করা হয়েছিল। ইসরাঈলী ঐতিহাসিক ইউসীফুল তাদেরকে সেথীন জাতি মনে করেন এবং তার ধারণা তাদের এলাকা কিষ্ণ সাগরের উওর ও পুর্ব দিকে অবস্থিত ছিল। জিরোম এর বর্ণনামতে মাজুজ জাতির বসতি ছিল ককেশিয়ার উওরে কাস্পিয়ান সাগরের সন্নিকটে।

ইয়াজূজ এবং মাজূজ হচ্ছে আদম সন্তানের মধ্যে দু-টি গোত্র, যেমনটি হাদিসে এবং বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। তাদের মধ্যে কিছু মানুষ অস্বাভাবিক বেঁটে, আবার কিছু অস্বাভাবিক লম্বা। কিছু অনির্ভরযোগ্য কথাও প্রসিদ্ধ যে তাদের মাঝে বৃহৎ কর্ণবিশিষ্ট মানুষও আছে, এক কান মাটিতে বিছিয়ে এবং অপর কান গায়ে জড়িয়ে বিশ্রাম করে।
বরং তারা হচ্ছে সাধারণ আদম সন্তান। বাদশা যুলকারনাইনের যুগে তারা অত্যধিক বিশৃঙ্খল জাতি হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল। অনিষ্টটা থেকে মানুষকে বাঁচাতে যুলকারনাইন তাদের প্রবেশ পথ বৃহৎ প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন।
নবী করীম (সা:) বলে গেছেন যে, ঈসা নবী অবতরণের পর তারা সেই প্রাচীর ভেঙে বেরিয়ে আসবে। আল্লাহ্‌র আদেশে ঈসা (আ:) মুমিনদেরকে নিয়ে তূর পর্বতে আশ্রয় নেবেন।
অতঃপর স্কন্ধের দিক থেকে এক প্রকার পোকা সৃষ্টি করে আল্লাহ্‌ তাদেরকে ধ্বংস করবেন। নিচে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হল:
ঐতিহাসিক সেই প্রাচীর নির্মাণ:
যুলকারনাইনের আলোচনা করতে গিয়ে আল্লাহ্‌ পাক বলেন- আবার সে পথ চতলে লাগল। অবশেষে যখন সে দুই পর্বত প্রাচীরের মধ্যস্থলে পৌঁছল, তখন সেখানে এক জাতিকে পেল, যারা তাঁর কথা একেবারেই বুঝতে পারছিল না। তারা বলল: হে যুলকারনাইন! ইয়াজূজ ও মাজূজ দেশে অশান্তি সৃষ্টি করেছে। আপনি বললে আমরা আপনার জন্য কিছু কর ধার্য করব এই শর্তে যে, আপনি আমাদের ও তাদের মধ্যে একটি প্রাচীর নির্মাণ করে দেবেন। সে বলল: আমার পালনকর্তা আমাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন, তাই যথেষ্ট। অতএব, তোমরা আমাকে শ্রম দিয়ে সাহায্য কর। আমি তোমাদের ও তাদের মধ্যে একটি সুদৃঢ় প্রাচীর নির্মাণ করে দেব। তোমরা লোহার পাত এনে দাও। অবশেষে যখন পাহাড়ের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান পূর্ণ হয়ে গেল, তখন সে বলল: তোমরা হাঁপরে দম দিতে থাক। অবশেষে যখন তা আগুনে পরিণত হল, তখন সে বলল: তোমরা গলিত তামা নিয়ে এসো, আনি তা এর উপর ঢেলে দেই। অতঃপর ইয়াজূজ ও মাজূজ তার উপরে আরোহণ করতে পারল না এবং তা ভেগ করতেও সক্ষম হল না…[সূরা কাহফ, আয়াত ৯২-৯৭]


কে সে যুলকারনাইন? তিনি হচ্ছেন এক সৎ ইমানদার বাদশা। নবী ছিলেন না (প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী), পৃথিবীর প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ভ্রমণ করেছেন বলে তাঁকে যুলকারনাইন বলা হয়। অনেকে আলেকজান্ডারকে যুলকারনাইন আখ্যা দেন, যা সম্পূর্ণ ভুল। কারন, যুলকারনাইন মুমিন ছিলেন আর আলেকজান্ডার কাফের। তাছাড়া তাদের দুজনের মধ্যে প্রায় দুই হাজার বৎসরের ব্যবধান। (আল্লাহ্‌ই ভাল জানেন)
বিশ্ব ভ্রমণকালে তিনি তুর্কী ভূমিতে আর্মেনিয়া এবং আজারবাইজানের সন্নিকটে দুটি পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছেছিলেন। এখানে দুটি পাহাড় বলতে ইয়াজূজ-মাজূজের উৎপত্তিস্থল উদ্দেশ্য, যেখান দিয়ে এসে তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করত, ফসলাদি বিনষ্ট করত। তুর্কীরা যুলকারনাইন সমীপে নির্ধারিত ট্যাক্সের বিনিময়ে একটি প্রাচীর নির্মাণের আবেদন জানাল। কিন্তু বাদশা যুলকারনাইন পার্থিব তুচ্ছ বিনিময়ের পরিবর্তে আল্লাহ্‌র প্রতিদানকে প্রাধান্য দিলেন। বললেন- ঠিক আছে! তোমরা আমাকে সহায়তা করো! অতঃপর বাদশা ও সাধারণের যৌথ পরিশ্রমে একটি সুদৃঢ় লৌহ প্রাচীর নির্মিত হল। ইয়াজূজ-মাজূজ আর প্রাচীর ভেঙে আসতে পারেনি।


আব্দুল্লাহ্‌ বিন আমর (রা:) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা:) বলেন- ইয়াজূজ-মাজূজ আদম সন্তানেরই একটি সম্প্রদায়। তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হলে জনজীবন বিপর্যস্ত করে তুলবে। তাদের একজন মারা যাওয়ার আগে এক হাজার বা এর চেয়ে বেশি সন্তান জন্ম দিয়ে যায়। তাদের পেছনে তিনটি জাতি আছে-তাউল, তারিছ এবং মাস্ক…[তাবারানী]
যুলকারনাইনের নির্মিত সুদৃঢ় প্রাচীরের দরুন দীর্ঘকাল তারা পৃথিবীতে আসতে পারেনি। প্রাচীরের ওপারে অবশ্যই নিজস্ব পদ্ধতিতে তারা জীবন যাপন করছে। তবে আদ্যাবধি তারা সেই প্রাচীর ভাঙতে নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তারা দৈনিক সে প্রাচীর কাটার প্রচেষ্টা করতে অব্যাহত রাখে। প্রাচীর কাটার কাজ যখন প্রায় শেষ হয়ে যাবে এমন সময় তারা মনে করে আরো অনেক কাজ বাঁকি আছে তখন তারা ফিরে চলে যায়, তারা চলে গেলে সে প্রাচীর আবার পূর্ণ হয়ে যায়। এভাবে প্রতিদিন তাদের প্রচেষ্ট চলে, কিন্তু কিয়ামতের আগে তারা সে প্রাচীর ভেঙ্গে বেরিয়ে আসবে।

যে ভাবে প্রাচীর ভেঙে যাবে: যুলকারনাইনের নির্মিত সুদৃঢ় প্রাচীরের দরুন দীর্ঘকাল তারা পৃথিবীতে আসতে পারেনি। প্রাচীরের ওপারে অবশ্যই নিজস্ব পদ্ধতিতে তারা জীবন যাপন করছে। তবে আদ্যাবধি তারা সেই প্রাচীর ভাঙতে নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত, প্রাচীরের বর্ণনা দিতে গিয়ে নবী করীম (সা:) বলেন- অতঃপর প্রতিদিন তারা প্রাচীর ছেদন কার্যে লিপ্ত হয়। ছিদ্র করতে করতে যখন পুরোটা উন্মোচনের উপক্রম হয়, তখনই তাদের একজন বলে, আজ তো অনেক করলাম, চল! বাকীটা আগামীকাল করব! পরদিন আল্লাহ্‌ পাক সেই প্রাচীরকে পূর্বের থেকেও শক্ত ও মজবুত রূপে পূর্ণ করে দেন। অতঃপর যখন সেই সময় আসবে এবং আল্লাহ্‌ পাক তাদেরকে বের হওয়ার অনুমতি দেবেন, তখন তাদের একজন বলে উঠবে, আজ চল! আল্লাহ্‌ চাহেন তো আগামীকাল পূর্ণ খোদাই করে ফেলব! পরদিন পূর্ণ খোদাই করে তারা প্রাচীর ভেঙে বেরিয়ে আসবে। মানুষের ঘরবাড়ী বিনষ্ট করবে, সমুদ্রের পানি পান করে নিঃশেষ করে ফেলবে। ভয়ে আতঙ্কে মানুষ দূরে দূরান্তে পলায়ন করবে। অতঃপর আকাশের দিকে তারা তীর ছুড়বে, তীর রক্তাক্ত হয়ে ফিরে আসবে। লৌহ প্রাচীর ভেঙ্গে পড়ার পর ইয়াজুজ মাজুজকে উচ্চ ভূমি হতে দৌড়াতে দৌড়াতে আসতে দেখা যাবে। তাদের প্রথম দলটি তবরিয়া উপসাগরের পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে এর সবটুকু পানি পান করে ফেলবে। অন্যদল সেখান দিয়ে গমনকালে শুষ্ক সমুদ্রের দিকে লক্ষ্য করে বলবে, এখানে কি কখনো পানি ছিল? হযরত ঈসা (আ:) ও তার সঙ্গী-সাথীগণ পাহাড় পর্বতে পরিবেষ্টিত ও অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়বেন। ভীষণ দুরাবস্থায় খাল কাটাবেন। খাদ্যের তীব্র অভাব দেখা দিবে। তখন গরুর একটি মাথা একশত দীনার হতেও উৎকৃষ্ট ও মূল্যবান বলে বিবেচিত হবে। তখন হযরত ঈসা (আ:) ও তার সাথীগণ মহান আল্লাহপাকের দরবারে কায়মনো বাক্যে দোয়া করবেন। আল্লাহপাক ইয়াজুজ মাজুজের উপর ‘নাতাফ’ নামক রোগ প্রেরণ করবেন। এটা এক প্রকারক্ষত রোগ। ফলে, সকল ইয়াজুজ মাজুজ এক সঙ্গে মৃত্যু বরণ করবে।

এরপর হযরত ঈসা (আ:) ও তার সঙ্গী-সাথীগণ সমতল ভূমিতে অবতরণ করবেন। দেখতে পাবেন, সমস্ত ভূখন্ড তাদের মৃতদেহে ভরে গেছে। তখন তারা এ দুর্বিসহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির জন্য অনুনয় বিনয়সহ আল্লাহর কাছে মিনতি জানাবেন। আল্লাহপাক দীর্ঘ গর্দান বিশিষ্ট এক প্রকার পাখী প্রেরণ করবেন। তারা মৃতদেহগুলো আল্লাহর ইচ্ছায় দূর অচেনা কোনো স্থানে নিয়ে নিক্ষেপ করবে। তারপর আল্লাহপাক মূষলধারে বৃষ্টিবর্ষণ করবেন। যার পানিতে সকল কাঁচা-পাকা ঘরবাড়ী, মাঠ-ময়দান বিধৌত হয়ে আয়নার মতো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে। অতঃপর আল্লাহর পক্ষহতে ভূমির প্রতি নির্দেশ হবে ‘তোমার উদ্ভিদ’ বের করো, ফলমূল বৃদ্ধি করো, বরকত ও কল্যাণ ফিরিয়ে দাও। তখন ভূমি উৎপাদিত আনারগুলো এত বড় হবে যে, একটি আনারের অংশ বিশেষ একদল লোক খেতে পারবে এবং তার খোসাতে ছায়া গ্রহণ করতে পারবে। দুগ্ধবতী পশুতে এ পরিমাণ দুধের বরকত হবে সে একটি উটনীর দুধ একটি সাম্প্রদায়ের লোক পান করে পরিতৃপ্ত হতে পারবে। একটি ছাগলের দুগ্ধ একদল মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে। (সহীহ মুসলিম ৪০১-৪০২)।

মঙ্গল সাম্রাজ্যের পতনঃ বাগদাদ জয়ের পর মঙ্গোলরা পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয় এবং আইয়ুবীদের থেকে সিরিয়া জয় করে। তাদের এই জয়ের পেছনে বেশ সহায়ক ভূমিকা পালন করে আর্মেনীয়দের সরাসরি সাহায্য এবং ক্রুসেডারদের নিষ্ক্রিয়তা। ফিলিস্তিনে এসে মঙ্গোলরা তাদের জয়যাত্রার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছায়। মিশরের নতুন মামলুক সুলতানাত ১২৬০ খ্রিস্টাব্দে আইন জালুত এর যুদ্ধে ‘বায়বার’ এর নেতৃত্বে মঙ্গোলদের পরাজিত করে। এর ফলে মঙ্গোল আগ্রাসন থেকে পবিত্র ভূমি মক্কা, মদিনা এবং জেরুজালেম সুরক্ষিত হয়। আর সেইসাথে নিশ্চিত হয় তৎকালীন বিশ্বের একমাত্র মুসলিম পরাশক্তি মামলুকদের নিরাপত্তা।

ইসলাম পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দিতে মঙ্গোলদের প্রচেষ্টা সফল না হলেও তারা মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রে এক গভীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক ক্ষত সৃষ্টি করে যায়। জনশূন্য করে রেখে যায় গোটা অঞ্চলকে। তারা সেচখাল, শস্যক্ষেত্র এবং অর্থনৈতিক অবকাঠামোগুলো এমনভাবে ধ্বংস করে দেয় যে সবকিছুই মেরামতের অযোগ্য হয়ে পড়ে। খিলাফতের মতো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যা মুসলিম উম্মাহ্‌কে বহু শতাব্দীকাল ধরে ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছিল তা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যায়।Text Box: দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার বেশীরভাগ মুসলিম অঞ্চলজুড়ে হুলাগু খানের সাম্রাজ্য

এরপর হুলাগু খানের বংশধরদের প্রতিষ্ঠিত মঙ্গোল ইলখানাত ১০০ বছরেরও বেশী সময় ধরে পারস্য, ইরাক এবং আনাতোলিয়া শাসন করে। যুগ ও শতাব্দীর পরিক্রমায় দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার মঙ্গোলরা ধীরে ধীরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ এবং পারস্য-তুর্কি সংস্কৃতি ধারণ করতে থাকে। কিন্তু তারপরও ১৩শ শতকে মঙ্গোলরা মুসলিম বিশ্বে যে ধ্বংসাত্মক ও নেতিবাচক প্রভাব রেখে গিয়েছিল তা উপেক্ষা করার কোন সুযোগ নেই।

মঙ্গোল আগ্রাসন হচ্ছে ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে হতাশাচ্ছন্ন যুগ। মুসলিম বিশ্ব ১৩শ শতকের মতো ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড এবং ধ্বংসযজ্ঞ এরপর আর দেখেনি। এই ওয়েবসাইটের বেশীরভাগ আর্টিকেলে ইসলামের ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায় ও শ্রেষ্ঠ অর্জনসমূহ তুলে ধরা হলেও নেতিবাচক দিকগুলোর ব্যাপারে সচেতন থাকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যেসকল কারণে নেতিবাচক দিকগুলো সংঘটিত হয়েছিল সেগুলোর প্রতি বেশী জোর দেয়া উচিত। মুসলিম বিশ্ব মঙ্গোল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সম্পূর্ণরূপে অক্ষম ছিল অনৈক্য এবং দুর্বল রাজনৈতিক ও সামরিক অবকাঠামোর কারণে। ইসলামের ইতিহাসজুড়ে, অনৈক্য সবসময়ই বিরোধীদের আগ্রাসন ডেকে এনেছে এবং পরাজয়ের দিকে ধাবিত করেছে। আর ঐক্য ধাবিত করেছে গুরুত্বপূর্ণ সব ইসলামী সাম্রাজ্য স্থাপনার দিকে যা উপকার সাধন করেছে শুধু মুসলিম বিশ্বেরই নয়, বরং গোটা বিশ্বের।

-রুহুল আমিন
[email protected]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *