সেলজুক সাম্রাজ্য: আব্বাসীয় খিলাফতের পতন বিলম্বকারী

সেলজুক সাম্রাজ্য: আব্বাসীয় খিলাফতের পতন বিলম্বকারী

আরব ইসলামী ভূখন্ডের পশ্চিমাঞ্চল এমন এক অঞ্চল যা নিয়ে একদিক থেকে সুন্নি আব্বাসীয় খিলাফত ও অপরদিক থেকে শিয়া ফাতেমীয় সাম্রাজ্য বিবাদে লিপ্ত ছিল এবং এই অঞ্চলেই সেলজুক সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন হয়। খ্রিস্টীয় একাদশ শতাব্দীতে সেলজুকগণ বিশাল তুর্কি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে, যা খোরাসান, মা-ওরাউন্নাহার,ইরান, ইরাক, শাম এবং এশিয়া মাইনরকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। সেলজুকরা ইরান ও ইরাকে বোয়াইহি শিয়াদের এবং মিশর ও শামে ফাতেমীয় উবাইদিয়্যাদের কর্তৃত্বের সামনে আব্বাসীয় খিলাফত ধ্বংসের মুখে পতিত হওয়ার পর আব্বাসীয় খিলাফতকে রক্ষা করে বাগদাদে নিজেদের ভিত মজবুত করে এবং সুন্নি মাজহাবকে সাহায্য করে ফাতেমীয়দের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল।সেলজুক নেতা তুঘরিল বেক ৪৪৭ হিজরিতে বোয়াইহিয়াদের পতন ঘটিয়ে সেলজুক সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন। তিনি বোয়াইহিয়াদের বাগদাদ থেকে বিতাড়িত করলে আব্বাসীয় খলিফা আল কায়েম বি আমারিল্লাহ তাকে বিশাল সম্বর্ধনা দেন এবং সুলতান রুকনুদ্দিন তুঘরিল বেক উপাধিতে ভূষিত করলে সেলজুক সাম্রাজ্য যেমন শক্ত ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত হয় তেমনি আব্বাসীয় খিলাফতও পতনের হাত থেকে রক্ষা পায়। আব্বাসীয় খলিফা তুঘরিল বেকের সাথে সম্পর্ক আরও জোরদার করার জন্য ১০৫৯ খ্রিস্টাব্দে তুঘরিল বেকের বড় ভাই জাফরি বেকের এক কন্যাকে বিয়ে করেন। অতঃপর ১০৬৪ খ্রিস্টাব্দে তুঘরিল বেক আব্বাসীয় খলিফার এক কন্যাকে বিয়ে করেন। কিন্তু এর পরের বছর তুঘরিল বেকের মৃত্যু ঘটে এবং এর আগেই তার হাত ধরে খোরাসান, ইরান, ইরাকে সেলজুকদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।চাচা তুঘরিল বেকের মৃত্যুর পর আলপ আরসালান রাজত্বের লাগাম তার হাতে তুলে নেন এবং প্রথম কয়েকবছরে ক্ষমতা নিয়ে সাম্রাজ্যে যে সংঘর্ষ সৃষ্টি হয় তা কঠোর হস্তে দমন করতে সক্ষম হন। এরপর তিনি বহিরাঞ্চলে সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোনিবেশ করেন এবং সমগ্র ইসলামী বিশ্বকে সুন্নি আব্বাসীয় খিলাফতের পতাকাতলে সমবেত করার চেষ্টা করেন। আলপ আরসালান শামের উত্তরাঞ্চল, আলেপ্পো সাম্রাজ্য দখল করে এবং সেখানকার শাসক মাহমুদকে তাদের কর্তৃত্ব মেনে নিতে বাধ্য করেন। অতঃপর তার তুর্কি সেনাপতি আতানসাজ শামের দক্ষনাঞ্চল আক্রমণ করে রামাল্লা, বায়তুল মুকাদ্দাস করায়ত্ত করে সেখানে সেলজুক সুলতানের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেন। ৪৬২হিজরিতে মক্কায় সেলজুক সুলতানের নামে খুতবা পাঠ শুরু হলে আলপ আরসালান মক্কার শাসক মুহাম্মদ বিন আবি হাশেমকে ৩০ হাজার দিনার উপহার দেন এবং মদিনায় অনুরূপ কাজ করলে ২০ হাজার দিনার দিবেন তার ঘোষণা দেন। ১০৭০ খ্রিস্টাব্দে রোমের সম্রাট ডোমান্স ডিওজিন্স সেলজুক সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রায় দুই লক্ষাধিক সৈন্য নিয়ে অভিযান পরিচালনা করতে আসলে আলপ আরসালান বুজুর্গ আলেম আবু নাসরের উপদেশে শুক্রবার জুমার সময় মালাজগির্দের যুদ্ধ নামক এ যুদ্ধ শুরু করেন এবং মাত্র ১৫ হাজার সৈন্য নিয়েই আল্লাহর অশেষ রহমতে বিজয়ী হন এবং এতে করে বাইজান্টাইনেও সেলজুক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয় যা আব্বাসীয় খিলাফতের পতনের পরও বহাল ছিল। বীর সিংহ উপাধিপ্রাপ্ত আলপ আরসালান ১০৭২ খ্রিস্টাব্দে ইউসুফ খাওয়ারেজমি নামক এক বিদ্রোহীর হাতে নিহত হন এবং তাকে মার্ভ শহরে তার পিতার কবরের পাশে সমাহিত করা হয়।আলপ আরসালানের মৃত্যুর পর তার পুত্র মালিক শাহ ক্ষমতা গ্রহণ করলে তার চাচা কিরমানের সেলজুকি শাসক কাওরুদ বিন জাফরি বিরোধীতা করলে হামজানের নিকটবর্তী এক স্থানে তাদের দুজনের মধ্যে সংঘর্ষ হয় এবং কাওরুদ পরাজিত ও নিহত হলে সাম্রাজ্যে মালিক শাহের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।সুলতান মালিক শাহের শাসনামলে সুলজুকি সাম্রাজ্য সবচেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করে যা পূর্বে আফগানিস্তান, পশ্চিমে এশিয়া মাইনর, দক্ষিণে শাম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এর সূচনা হয়েছিল ১০৭৫ খ্রিস্টাব্দে তার সেনাপতি আতসাজের কাছে দামেস্কের পতনের পর থেকেই। ১০৭৭ খ্রিস্টাব্দে শামের এসব অঞ্চলে তার ভাই তাজুদ্দৌলা তাতমাশকে প্রশাসক নিযুক্ত করা হয়। সুলতান মালিক শাহ সুলাইমান বিন কাতলামাশ বিন ইসরাইলকে এশিয়া মাইনরের প্রশাসক নিযুক্ত করেন এবং ১০৭৭ খ্রিস্টাব্দে তার অধীনে রোম বিজিত হলে সেখানে সেলজুক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয় যা ২২৪ বছর স্থায়ী হয়েছিল। মালিক শাহের আমলে মিশরের ফাতেমীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সেনাপতি আতসাজের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা হলে তা ব্যর্থ হয়। ১০৯২ খ্রিস্টাব্দে মালিক শাহ মৃত্যুবরণ করলে সাম্রাজ্যের দুর্বলতা শুরু হয়।আলপ আরসালান ও মালিক শাহের শাসনামলে সেলজুকদের উজির ছিল নিজামুল মুলক, যিনি খুবই দক্ষ হাতে সাম্রাজ্যের চেহারা পাল্টে দেন। তিনি ছিলেন বুদ্ধিমান রাজনীতিজ্ঞ, বিচক্ষণ, সৌভাগ্যবান, ধার্মিক, ক্বারি ও ফকিহগণের মজলিশের স্থপতি।সুলতান মালিক শাহের মৃত্যুর পর তার চার পুত্রের মধ্যে মাহমুদ শাসনক্ষমতা গ্রহণ করে। এরপর থেকেই ক্ষমতার লোভে পড়ে সাম্রাজ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়ে সাম্রাজ্য দুর্বল হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ১১২৮ খ্রিস্টাব্দে খাওয়ারিজমের শাহেন শাহের হাতে সেলজুক সুলতান গিয়াসউদ্দিন আবু সুজার পরাজয় ঘটলে তাদের পতন ঘটে এবং এ পতন খিলাফতে আব্বাসীয়ার পতনকেও ত্বরান্বিত করেছিল।সেলজুক সাম্রাজ্যের পতনের কারণের মধ্যে সেলজুকদের মধ্যে ভাই-চাচা-সন্তানের মধ্যে ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্ব, প্রশাসনিক বিষয়ে মহিলাদের অনুপ্রবেশ, আমির উমারা উজির আতাবেকদের বিদ্বেষের মাধ্যমে ফিতনার আগুন জ্বালানো, আব্বাসীয় খলিফাগণের দুর্বলতা, নিকৃষ্ট বাতেনিয়্যাহদের চক্রান্ত সমুদ্রের ওপার থেকে আগত ক্রুসেড যুদ্ধ প্রভৃতি ছিল অন্যতম।উম্মাহর জন্য সেলজুকদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও বিশাল অবদান রয়েছে। আব্বাসীয় খিলাফতের পতন দুই শতাব্দী বিলম্বিত করার ক্ষেত্রে সেলজুকদের ভূমিকা রয়েছে, কারণ তুঘরিল বেক বোয়াইহিয়া ও রাফেজিদের চাপে পড়ে পতনের দ্বারপ্রান্তে যাওয়া খিলাফতকে রক্ষা করেছিল। সেলজুকগণ তাদের অধীন অঞ্চলে জ্ঞানচর্চার ও প্রশাসনিক বিপ্লব ঘটান। তারা সুন্নি মতবাদ ও সুন্নি আলেমদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। তারাই প্রথম ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। এভাবেই সেলজুক সাম্রাজ্য ইসলামের সমৃদ্ধিতে অবদান রাখে।

Meher Ali Khan
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *