তুরস্ক ও বাংলাদেশের শেকড়ের টান কেন এত সুগভীর?

তুরস্ক ও বাংলাদেশের শেকড়ের টান কেন এত সুগভীর?

আমাদের সম্পর্ক তো সেই বখতিয়ার খিলজীর সময়কাল থেকেঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।তুরস্কের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের গভীরতা বোঝাতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন,আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে তুরস্ক স্বীকৃতি দেয় ১৯৭৪ সালে।তবে তুর্কী বীর বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয়ের মাধ্যমে তুরস্ক ও বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক শুরু হয় সেই ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে।ত্রয়োদশ শতকের প্রথমেই তুর্কি বীর বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয়ের পরেই বাংলায় ইসলামি শাসনের সূচনা হয়। তুর্কী বীর বখতিয়ার খিলজীর রাজ্য ছিল মুসলিম অধিকারের কেন্দ্রস্থল। ১২০৬ সালে বখতিয়ার খিলজী কর্তৃক বাংলা বিজয়ের পর এ অঞ্চলে মুসলিমরা একচ্ছত্রভাবে রাজ্য শাসনের সুযোগ পায়। বাংলা হয়ে উঠে মুসলমানদের অন্যতম আবাসভূমি। সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের ৩য় বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠীর আবাসভূমি হিসেবে গড়ে উঠে বাংলা।মুসলিম বাংলা গঠনে তাই সর্বপ্রথমই চলে আসে বখতিয়ার খলজির কথা।আর এই তুর্কী বীরই হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশ ও তুরস্ককে নিয়ে এনেছিলো এক মোহনায়।শাহজালাল ইয়েমেনি নামক এক জাতিগত তুর্কী গৌরগোবিন্দ নামক অত্যাচারী শাসককে উৎখাত করে সর্বপ্রথম সিলেটে রাজনৈতিকভাবে ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করেন।সুফিধারার এই পীরের ওস্তাদ জালালুদ্দিন রুমিও হচ্ছেন বিখ্যাত তুর্কী কবি ও দার্শনিক।বাংলাদেশে এককভাবে শাহজালাল ইয়েমেনির নামেই সবচেয়ে বেশি স্থাপনা আছে।এই তুর্কী সাধকের কবর এখনো বাংলাদেশের অন্যতম ধর্মীয় ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা।বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মিশে আছে সকল বাংলাদেশীর হৃদয়ে।এই বিখ্যাত কবির কাব্যে তুর্কী কবি জালালুদ্দিন রুমীর প্রভাব সুস্পষ্ট। এছাড়াও কাজী নজরুল ইসলাম আধুনিক তুর্কী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় ব্যাপক খুশী হয়েছিলেন তুর্কীদের বিজয়ে।আর তাইতো তিনি লিখে ফেলেন “কামাল পাশা” নামক ঐতিহাসিক এক কবিতা।(কামাল পাশার নেওয়া পাশ্চাত্যবাদী নীতির আগে এই কবিতাটি রচনা করা হয়।)ইসলামের ইতিহাসে সুদীর্ঘকাল ধরে বিদ্যমান উসমানীয় খিলাফত কে ব্রিটিশ ও আরব ষড়যন্ত্রে উৎখাত করা হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপরই।বাংলাদেশ তথা ভারতবর্ষ কখনোই উসমানীয় খিলাফতের অধীনে ছিলো না।কিন্তু এক অদৃশ্য ভ্রাতৃত্ব এ উপমহাদেশের মানুষকে চুপ থাকতে দেয়নি।খিলাফত উৎখাতের ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে ভারতবর্ষ জুড়ে গড়ে উঠে ” খিলাফত আন্দোলন “।আলী ভ্রাতৃদ্বয়ের নেতৃত্বে গড়ে উঠা এই আন্দোলনে হিন্দু নেতৃবৃন্দ পর্যন্ত সংহতি জানান।মহাত্মা গান্ধী তার ” অসহযোগ আন্দোলন ” এর সাথে “খিলাফত আন্দোলন ” কে অঙ্গীভূত করেন একটা সময় পর্যন্ত।পাশাপাশি ভারতীয় মুসলিমরা ব্যাপকহারে চাঁদা তুলে তুরস্ককে সহায়তা করার জন্য। ভারতবর্ষের টাকায় গড়ে উঠে তুরস্কে “উস ব্যাংক”২০১৭ সালে “রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আগমন” নিয়ে এক মহা সমস্যায় পড়তে হয় বাংলাদেশকে।সে সময় চীন ও ভারতের মতো বন্ধু রাষ্ট্র ও বাংলাদেশের পাশে ছিলো না।অথচ হাজার মাইল দূরের তুরস্ক সে সময় রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশের পক্ষ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন।তুর্কী ফাস্ট লেডি বাংলাদেশে আগমন করেন এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যান।রাজনৈতিক কারণে শেখ হাসিনা সরকারের সাথে একটাসময় তুরস্কের একটু দূরত্ব তৈরি হলেও “রোহিঙ্গা সংকট” তুরস্ক ও বাংলাদেশকে আবার এক মোহনায় নিয়ে আনে।উন্নয়নশীল মুসলিম দেশগুলোর সংগঠন “D-8″। তুরস্ক কর্তৃক তৈরি হওয়া এই সংগঠনে বাংলাদেশ ও সক্রিয় সদস্য।শেষ করছি একটা মজার তথ্য দিয়ে,বাংলা ভাষায় বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ হলো ” বাবা”। অথচ এই শব্দটি যে তুর্কী ভাষা থেকে আগত তা বোঝারও জো নাই।যেমনটা জো নাই বুঝার তুর্কীদের প্রতি বাংলাদেশীদের আত্নার টানের রহস্য!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *